জীবনের জন্য উপদেশ
সিডনির একজন তরুণ আমাকে বলেছিল যে, সে একবার থাইল্যান্ডে গিয়ে আমার গুরু আজান চাহ-র সাথে দেখা করেছিল, আর জীবনের সেরা উপদেশটি লাভ করেছিল তার কাছ থেকে। বৌদ্ধধর্মে আগ্রহী অনেক পশ্চিমা তরুণ ১৯৮০ সালের দিকে আজান চাহ-র নাম শুনেছিল। এই তরুণটি থাইল্যান্ডে একটা লম্বা ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিল। উদ্দেশ্য একটাই, সেই মহান ভিক্ষুর সাথে দেখা করবে, এবং তাকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করবে।
এটা ছিল দীর্ঘ সফর। সিডনি থেকে ব্যাংককে পৌঁছাতে তার আট ঘণ্টা লাগল। সেখান থেকে রাতের ট্রেনে আরও দশ ঘণ্টা লাগল উবন শহরে পৌঁছাতে। সেখানে পৌঁছে সে আজান চাহ-র বিহার ওয়াট পাহ্ পং-এ যাওয়ার জন্য একটা ট্যাক্সি ভাড়া করল। ক্লান্ত কিন্তু উজ্জীবিত, সে অবশেষে আজান চাহ-র কুটিরে পৌঁছল।
গুরু হিসেবে আজান চাহ্ ছিলেন বিখ্যাত। তিনি বরাবরের মতোই তার কুটিরে বসে ছিলেন। তার চারপাশে ঘিরে ছিল অনেক ভিক্ষু ও জেনারেল, গরিব কৃষক ও ধনী ব্যবসায়ী, গ্রামের ছেঁড়া কাপড় পরা মেয়ে ও ব্যাংককের সুন্দর পোশাকের মহিলা, সবাই পাশাপাশি বসা। আজান চাহ-র কুটিরে কোনো ভেদাভেদ নেই।
অস্ট্রেলিয়ান যুবকটা সেই বিরাট জনতার একধারে বসে পড়ল। দু ঘণ্টা কেটে গেল। আজান চাহ্ তাকে খেয়ালও করেন নি। তার সামনে আরও অনেক লোক। হতাশ হয়ে সে উঠে চলে গেল সেখান থেকে। বিহারের প্রধান গেটে যাওয়ার সময় সে দেখল ঘণ্টা বাজানোর মন্দিরে কিছু ভিক্ষু উঠোন ঝাড়ু দিচ্ছে। গেটে তাকে নিতে আসবে যে ট্যাক্সিটা, সেটা আসতে আরও ঘণ্টাখানেক বাকি। তাই সেও হাতে একটা ঝাড়ু তুলে নিল এই ভেবে যে, অন্তত কিছু পুণ্যকর্ম করে যাই।
প্রায় আধ ঘণ্টা পরে, সে যখন ঝাড়ু দিতে ব্যস্ত অনুভব করল যে কেউ একজন তার কাঁধে হাত রাখল। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে অবাক ও যারপরনাই খুশি হয়ে দেখল যে হাতের মালিক আজান চাহ্ তার সামনে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন। আজান চাহ্ এই পশ্চিমা তরুণটিকে দেখেছিলেন আগেই, কিন্তু তাকে সেটা বলার কোনো সুযোগ তখন ছিল না। এখন তিনি আরেকটা কাজে বিহারের বাইরে চলে যাচ্ছেন। তাই তিনি এত কষ্ট করে সিডনি থেকে আসা এই তরুণের সামনে একটু দাঁড়ালেন তাকে একটা উপহার দেওয়ার জন্য। তিনি থাই ভাষায় দ্রুত কিছু একটা বলে তার কাজে চলে গেলেন।
এক অনুবাদক ভিক্ষু তাকে বলে দিল, ‘আজান চাহ্ বলেছেন যে, যদি তুমি ঝাড়ু দাও, তো তোমার যা কিছু আছে, তার সবকিছু নিয়েই ঝাড়ু দাও।’ এরপর সেই অনুবাদক ভিক্ষুও গিয়ে আজান চাহ-র সাথে যোগ দিল।
তরুণটি অস্ট্রেলিয়া ফেরার দীর্ঘ যাত্রায় সেই ছোট্ট শিক্ষাটা নিয়ে ভাবল। সে নিশ্চিত বুঝতে পারল যে, আজান চাহ্ তাকে শুধু কীভাবে ঝাড়ু দিতে হয় তা শেখান নি; বরং এর থেকে ঢের বেশি শেখাতে চেয়েছেন। এর অর্থটা তার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল।
'তুমি যা-ই করো না কেন, তোমার সবকিছু নিয়েই সেটি করো।’ সে অস্ট্রেলিয়া ফেরার কয়েক বছর পরে আমাকে বলেছিল যে, এই ‘জীবনের জন্য উপদেশ’

No comments